ই-পেপার/প্রিন্ট ভিউ
স্টাফ রিপোর্টার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অধ্যায় আজ চিরতরে সমাপ্ত।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পবিত্র সমাধির সান্নিধ্যে, নীরবতা আর অশ্রুর আবরণে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগে রাজধানীর এবারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদারের দেওয়া নাম ছিল খালেদা খানম পুতুল। সময়ের পরিক্রমায় সেই ‘পুতুল’ই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি পরিচিত হন বেগম খালেদা জিয়া নামে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের শুরুর কয়েক বছর তিনি করাচিতে অবস্থান করেন, পরে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন।১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একজন গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে তাঁর আবির্ভাব ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। পরে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে দলটি।২০ মার্চ ১৯৯১ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার এ মেয়াদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে সংসদ টেকেনি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাসের পর ৩০ মার্চ ১৯৯৬ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। এ মেয়াদে তিনি মাত্র ১২ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১০ অক্টোবর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন এবং পূর্ণ ৫ বছর দায়িত্ব পালন করে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করা হয় তাঁর উদ্যোগেই। একই বছরে দেশের রাজস্ব কাঠামোকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) ব্যবস্থা চালু করা হয়। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ১৯৯৬ সালে সংবিধানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় - ২০০৬ সালে সরকারের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ২০০৭ সালের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সে সময় খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই সন্তান দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হন। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাঁকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।পরবর্তীতে গুরুতর অসুস্থতার কারণে ২০১৯ সালে তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালের মার্চে মানবিক বিবেচনায় তাঁকে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করে মুক্তি দেওয়া হয়, যদিও রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জুলাই বিপ্লবের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান।
দীর্ঘদিন লিভার, কিডনি ও হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতায় ভুগে অবশেষে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। রেখে যান দুই পুত্র—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো—সহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী ও অনুসারী।সংগ্রাম, নেতৃত্ব, বিতর্ক ও ইতিহাস—সব মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের।