রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নিজস্ব কার্যালয়ে খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে “বাংলাদেশের আর্থসামাজিক মান উন্নয়নে কল্যাণ ট্রাস্টের ভূমিকা” শীর্ষক ছয় দিনব্যাপী কর্মশালা। কর্মশালায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, ঐতিহাসিক স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় উন্নয়নে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুর রহমান। কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, গবেষক এবং সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সার্বিক উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ৭ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান মো. সোলাইমান মিয়া, মহাসচিব শফিকুল ইসলাম (বাবু), যুগ্ম মহাসচিব সেলিম রাজু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী আ.জ.ম. খায়রুল বাশার (রনি), কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম, গাজীপুর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের আহ্বায়ক মো. আলমগীর হোসেন জাকিরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি। বীর মুক্তিযোদ্ধারা কেবল ইতিহাসের অংশ নন, তাঁরা জাতির আত্মমর্যাদা, সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল প্রতীক। তাই তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং পরিবারগুলোর কল্যাণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের মহাসচিব শফিকুল ইসলাম (বাবু) বলেন, “প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাস বিকৃতি রোধ করে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও চেতনা পৌঁছে দেওয়া সময়ের দাবি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ, চিকিৎসা, আবাসন, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
কর্মশালায় বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা, গণকবর, স্মৃতিসৌধ ও যুদ্ধক্ষেত্রের বহু নিদর্শন অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার ১১ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সাব-সেক্টর মহিষখলায় ২০১২ সালে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। সেখানে কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই, নেই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী জনবলও। জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
বক্তারা আরও বলেন, দেশ বর্তমানে নানা দেশি-বিদেশি অপশক্তির ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে দল-মত নির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রকাশনা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কর্মশালায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের গবেষণা কার্যক্রম জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ, বেদখল ও অচল সম্পত্তি পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধকরণ এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সমন্বয়ে কল্যাণমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মো. সোলাইমান মিয়া বলেন, “উপস্থাপিত ৭ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।”
ছয় দিনব্যাপী কর্মশালার সমাপনী পর্বে বক্তারা মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে আরও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান। পাশাপাশি উপস্থাপিত ৭ দফা প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করা হয়।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা, তাঁদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষ আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
জাতীয় চেতনা, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করতে উপস্থাপিত ৭ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন কর্মশালার অংশগ্রহণকারীরা।