"চট্টগ্রামে বন্যায় কবলিত পড়ে গর্ভে ৯ মাসের সন্তান নিয়েও জীবন বাঁচাতে গাছে উঠেছেন একজন মা"— এমন শিরোনামে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বিকেলে 'নীলকণ্ঠ' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পরে আবু আহমেদ চৌধুরী জানু নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সেটি শেয়ার করা হলে ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
তবে ভিডিওটির তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, এটি সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের বন্যার কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরে আনন্দ ভ্রমণের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও, যা নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচ-এর অনুসন্ধানেও একই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভাইরাল দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই অঞ্জনার জীবনের কথা একটি ফেসবুক পেজে ভিডিওটির অনুরূপ সংস্করণ পাওয়া যায়। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই Joynal Anjana Vlogs (অঞ্জনার জীবনের কথা) নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল/পেজেও একই ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে এটি টাঙ্গুয়ার হাওরে আনন্দ ভ্রমণের সময় ধারণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে কোনো দুর্যোগ বা জীবন বাঁচানোর পরিস্থিতি ছিল না। বরং ওই নারী পানির মধ্যে থাকা একটি গাছের ডালে বসে আনন্দের ছলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। ভিডিওতে তাকে ক্যামেরার পেছনে থাকা ব্যক্তিকে সুন্দর একটি ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করতেও শোনা যায়। কিন্তু বর্তমানে ভাইরাল হওয়া সংস্করণে মূল অডিও সরিয়ে আবেগঘন গান যুক্ত করা হয়েছে, ফলে অনেকেই এটিকে বন্যার বাস্তব দৃশ্য বলে মনে করছেন।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ভিডিওটির পরিবেশ চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভিডিওর মন্তব্যগুলোতেও অনেক ব্যবহারকারী স্থানটিকে টাঙ্গুয়ার হাওর হিসেবে শনাক্ত করেছেন। স্থানটির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
এদিকে ভিডিও থেকে নেওয়া একটি স্থির ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদনার লক্ষণও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ফ্যাক্টওয়াচ। ছবিতে গাছের ডাল ধরে থাকা হাতের আঙুলের গঠন ও অবস্থানে অসামঞ্জস্য এবং অন্য হাতের অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি এআই-নির্ভর সম্পাদনার ইঙ্গিত দেয়। তবে মূল ভিডিওতে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় গর্ভবতী কোনো নারী গাছে আশ্রয় নেওয়ার এমন ঘটনার বিষয়ে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমেও তথ্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে চলতি বছরের ৫ জুলাই থেকে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ওই ঘটনারও অনেক আগের। সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ফ্যাক্টওয়াচ দাবিটিকে 'মিথ্যা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদের উপ-মহাসচিব মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “দুর্যোগের সময় একটি ভুল সংবাদ বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও হাজারো মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাই দ্রুত সংবাদ প্রকাশের চেয়ে সঠিক সংবাদ প্রকাশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো ভিডিও বা তথ্যকে যাচাই ছাড়া সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। আমরা দেশের সকল সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীর প্রতি আহ্বান জানাই, পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতা বজায় রেখে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করুন এবং ভুয়া তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকুন।”