তাহিরপুরে জনদুর্ভোগ চরমে, দ্রুত মেরামত ও নতুন সেতু নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর
তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ, প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের লিলা বাজার-সংলগ্ন মাটিকাটা কুড়ির খালের ওপর নির্মিত লোহার সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেতুর বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় এবং পাটাতন উঠে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। ভেঙে পড়া অংশের নিচে দুর্বল বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কমেনি দুর্ঘটনার আশঙ্কা। দ্রুত সেতুটি মেরামত অথবা নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় খাল পারাপারের দুর্ভোগ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল এই সেতু। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেটিই এখন এলাকাবাসীর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন মোটরসাইকেল, ঠেলাগাড়ি ও পায়ে হেঁটে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেতু পার হতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়ে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির পাটাতন বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে, কোথাও কোথাও পাটাতন নেই। দুই পাশে রেলিং থাকলেও দক্ষিণ পাশের বেশ কিছু অংশে তা অনুপস্থিত। সেতুর পিলার মাটির নিচের দিকে দেবে যাওয়ায় তিনটি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অংশের নিচে বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষ ও মোটরসাইকেল সেতুতে উঠলে সেটি শব্দ করে, কেঁপে ওঠে এবং সামান্য নড়াচড়া করে। এতে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প কোনো সড়ক বা সেতু না থাকায় বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু ব্যবহার করতে হচ্ছে। যেকোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় মাটিকাটা কুড়ির খাল পারাপারে বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করতেন আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ। ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মোটরসাইকেল চালক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের দিকে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের উদ্যোগে খালের ওপর দুটি পিলার স্থাপন করে লোহার পাটাতনের সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
সেতুটি নির্মাণের পর এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বর্তমানে এর অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে।
সেতুটি বাদাঘাট ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এবং উত্তর বড়দল ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। আমতৈল, চরগাঁও, ব্রাহ্মণগাঁও, বোরোখারা, ট্যাটাপাড়া, হলহলিয়া, রামেশ্বরপুর, পুরানঘাট, একতা, কাউকান্দি, বড়দল, কামারকান্দি, পুরানখালাস, সাধেরকলা ও মাটিকাটাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই সেতু ব্যবহার করেন।
এ ছাড়া বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন ও পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সেতুটির গুরুত্ব রয়েছে। মাটিকাটা রহমানিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, প্রতিভা কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মাটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাজী এম এজাহের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এই পথ ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের দাবি, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সেতুটি দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন।
সাতগ্রাম ঈদগাহ মাঠ, মাটিকাটা গ্রামের একাংশের কবরস্থান এবং খালের অপর পাশে অবস্থিত মসজিদে যাতায়াতের জন্যও সেতুটি ব্যবহার করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ছফুর উদ্দিন বলেন, “সেতুটিতে উঠলেই ভয় লাগে, কখন ভেঙে পড়ে যায়। আবার পায়ে আঘাত পাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এরপরও কী করব, আস্তে আস্তে দেখে-শুনে সেতু পার হয়ে বাজারে ও মসজিদে যেতে হয়।”
আয়দর আলী বলেন, “সেতুটি ঠিক না করলে আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না। কিছুদিন আগে সেতু পার হতে গিয়ে একজন পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।”
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক সুহেল ও আশরাফ উদ্দিন বলেন, “ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোর পর সেতুটি পার হয়ে নিরাপদে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন ভেঙে পড়ে, সেই আশঙ্কা সব সময় কাজ করে। জনস্বার্থে দ্রুত সেতুটি মেরামত করা অথবা নতুন সেতু নির্মাণ করা জরুরি।”
দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস আলী বলেন, সেতুটির বর্তমান অবস্থা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি বিভিন্ন সভায় তুলে ধরা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কয়েক দিন আগে সেতুটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি আশা করছেন, উপজেলা প্রশাসন দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সেতুটিকে আপাতত মেরামত করে দেওয়া হবে, যেন চলাচলে কোনো সমস্যা না হয়। এখানে নতুন একটি সেতু নির্মাণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী জানান, সেতুটি নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু সাময়িকভাবে বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া নয়, সেতুটির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।