সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে মাদক উদ্ধারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভিডিওতে এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার কাছ থেকে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের দৃশ্য দেখা গেলেও, উদ্ধার করা কথিত মাদকের পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গেছে, গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে তাহিরপুর উপজেলার দিঘীরপাড় এলাকায় কথিত এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের একটি ভিডিও ৯ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশের পর তা ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে বাপ্পি নামে এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়। তিনি উপজেলার কামড়াবাদ গ্রামের মান্নানের ছেলে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। ভিডিওতে তার কাছ থেকে আনুমানিক ৫০০ গ্রাম গাঁজা, দুটি ট্যাবলেট, ফয়েল পেপার, পাইপসহ মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের দাবি করা হয়। তবে ভিডিওতে দেখা দুটি ট্যাবলেট কী ধরনের মাদক, তা কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে কি না—এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় যুবককে কয়েকটি নাম ও স্থানের বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায়। এর মধ্যে ‘মোল্লাপাড়া হাজী আরিফ’ নামটিও উঠে আসে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনাটিতে মাদক নির্মূল কমিটির কয়েকজন সদস্যের সংশ্লিষ্টতা ছিল। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা মাদক নির্মূল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ আল সুজনের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা অনেকদিন আগের ঘটনা। সুতরাং এটাকে সামাজিকভাবে শেষ করেছিলাম। সুতরাং এই বিষয়ে আর কোনো কিছু বলতে চাচ্ছিলাম না। অন্য কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারেন।”
তার এই বক্তব্যের পরই মূল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—মাদক উদ্ধারের মতো একটি ঘটনা কীভাবে ‘সামাজিকভাবে শেষ’ করা হলো এবং অভিযানে উদ্ধার করা কথিত মাদক কোথায় রাখা বা হস্তান্তর করা হয়েছিল?
এ বিষয়ে তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফারুক আহমেদ বলেন, “এই অভিযানের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আপনারা সংবাদ প্রকাশ করুন, আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদক উদ্ধারের কোনো ঘটনাকে সামাজিকভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। উদ্ধারকৃত মাদক যথাযথ প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসন অথবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
উপজেলা মাদক নির্মূল ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন হুদা। তিনি বলেন, “বিষয়টি আমরা জেনেছি, তারা সামাজিক ভাবে সমাধান করছে, তবে মাদক কি করা হয়েছে এ ব্যাপারে আমি জানিনা।
ফলে একই ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। মাদক উদ্ধারের দাবি সত্য হলে উদ্ধারকৃত মাদক কোথায়? তা কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে এবং কার সিদ্ধান্তে ঘটনাটি ‘সামাজিকভাবে সমাধান’ করা হলো? আর অভিযানে ব্যবহৃত বা উদ্ধার করা আলামতের কোনো জব্দ তালিকা কিংবা আইনগত নথি রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও এখন আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা। কিন্তু কোনো মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে সেটি আইনগত প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা, উদ্ধারকৃত আলামতের প্রকৃতি এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থান—এসব বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।