২০ হাজার টাকা দাবি ও সম্মানী আটকে রাখার অভিযোগ শিক্ষকদের, অস্বীকার হাবিবুর রহমানের
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ইসলামী ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের কয়েকটি শিক্ষা কেন্দ্র বাতিল এবং শিক্ষকদের সেপ্টেম্বর মাসের সম্মানী নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কেন্দ্র বহাল রাখার জন্য ২০ হাজার টাকা করে দাবির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তা অস্বীকার করেছেন উপজেলা পর্যায়ের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. হাবিবুর রহমান। তাঁর দাবি, সরেজমিনে পরিদর্শনে অস্তিত্বহীন ও নিয়মবহির্ভূত কেন্দ্র পাওয়ায় সেগুলো বাতিল করা হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাক-প্রাথমিক ও সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি কয়েকটি কেন্দ্রে নোটিশ জারি করে জবাব চাওয়া হয়। শিক্ষকদের অভিযোগ, নোটিশের জবাব দেওয়ার পরও কেন্দ্র বহাল রাখার জন্য তাঁদের কাছে পৃথকভাবে ২০ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে না পারায় সেপ্টেম্বর মাসের সম্মানী আটকে রাখা এবং কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও করেন তাঁরা।
এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষিকারা ইসলামী ফাউন্ডেশনের সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করে সেপ্টেম্বর মাসের সম্মানী প্রদান, কেন্দ্রগুলো বহাল রাখা এবং অভিযোগের তদন্ত দাবি করেছেন।
তাহিরপুর উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও বন্দরেরহাটি জামে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক মোহাম্মদ মকবুল হোসেন অভিযোগ করেন, কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তাঁর কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশের পর তাঁকে কেন্দ্র স্থানান্তরের বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয় বলে তিনি জানান। পরে সেপ্টেম্বর মাসের সম্মানী কম পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তাঁকে সুপারভাইজারের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। তাঁর দাবি, টাকা না দেওয়ায় কেন্দ্রটি বাতিল করা হয়েছে। কেন্দ্রটির কোড নম্বর ৯৪০।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নাগরপুর মধ্যপাড়া জামে মসজিদ শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, কেন্দ্র বহাল রাখার জন্য ২০ হাজার টাকা চাওয়া হলে তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। এরপরও বাকি টাকা দাবি করা হয় এবং পরে কেন্দ্র বাতিলের কথা জানানো হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির কোড নম্বর ৯৪৯।
এ ছাড়া আরও কয়েকজন শিক্ষক তাঁদের কেন্দ্রের অবস্থান, শিক্ষাগত সনদ এবং কেন্দ্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ফিল্ড সুপারভাইজার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন, “আমি যদি টাকা নেব, তাহলে কেন্দ্র বাতিল করব কেন?”
হাবিবুর রহমানের দাবি, সরেজমিনে পরিদর্শনে বাতিল করা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ছয় থেকে সাতটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কিছু কেন্দ্রে গিয়ে মাত্র আট থেকে দশজন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে। আবার যেসব স্থানে কেন্দ্র থাকার কথা, সেখানে কেন্দ্র না পেয়ে অন্য স্থানে পরিচালিত হতে দেখা গেছে। কোনো কোনো এলাকায় একাধিক কেন্দ্র রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রগুলো মসজিদে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও কয়েকটি বাড়িতে পরিচালিত হতে দেখা গেছে। এসব অনিয়মের কারণে কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
এক শিক্ষকের সনদসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর সনদ যাচাই-বাছাই করে সেটি জাল বলে জানা গেছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে যাচাই প্রতিবেদন বা দাপ্তরিক নথি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সরকারি ভাতার তালিকা তৈরির নামে জনপ্রতি ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান বলেন, “এই কাজটি আমি করিনি। এই কাজটি অন্য ডিপার্টমেন্ট করেছে।”
অন্যদিকে, অভিযোগকারী কয়েকজনের দাবি, তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে এবং তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এবং তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব কার ছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষকদের অভিযোগ ও সুপারভাইজারের বক্তব্যে কেন্দ্র বাতিলের কারণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষকদের দাবি, অর্থ দিতে না পারায় তাঁদের কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, সুপারভাইজারের বক্তব্য, অস্তিত্বহীন ও নিয়মবহির্ভূত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় বাতিল করা কেন্দ্রগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, কেন্দ্রের অনুমোদিত অবস্থান, সনদ যাচাইয়ের প্রতিবেদন এবং সেপ্টেম্বর মাসের সম্মানী আটকে রাখার দাপ্তরিক কারণ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থ দাবির অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক-শিক্ষিকারা।