কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় দখলে জর্জরিত হিসনা নদীর খনন কাজ সরকারিভাবে শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের(পাউবো) তদারকিতে আমিন এণ্ড কোং,ইউনুস এণ্ড ব্রাদারস্,ন্যাচারাল,শামীমুর এই
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে হিসনা খনন কাজের টেন্ডার দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভেড়ামারা, মিরপুর ও দৌলতপুর অংশে হিসনা নদীর মোট ৪২.৪ কি:মি: অংশ খনন হবে,যেখানে চওড়া বেড ২০-২৬ মিটার,ঢাল ১:২-১:১.৫, তলদেশ থেকে গভীরতা কাটা হবে ৩.৫ -৫ মিটার,কিনার থেকে কিনারের দৈর্ঘ্য ২৬-২৮ মিটার এবং যার ভেড়ামারা অংশে ৫.৮ কি:মি: খনন হবে।
কিন্তু কোথায় কতটুকু খনন হবে, নদীর দুই পাড়ের দখল উচ্ছেদ কিভাবে করা হবে, এসব বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। আর এই নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে আস্থাহীনতা আর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, নদীরপাড় দখলমুক্ত করে খনন কাজের রোডম্যাপ জনসম্মুখে দ্রুত প্রকাশ করা হোক।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ২৫শে মে ঈদুল আযহার ছুটি চলাকালীন সময়ে ৯টি এস্কেভেটর ব্যবহার করে ভেড়ামারার কোদালিয়া পাড়া অংশে হিসনা নদীর খনন কাজ শুরু হয়েছে। এসময় নদীর পানি সেকে বাঁধ দিয়ে কাদামাটিতেই চলছিল খননকার্য।
নদীর কতটুকু অংশ খনন হবে জানতে চাইলে সাইড ম্যানেজার শাকিল আহমেদ মোবাইলে জানান, নদীর দুই পাড়ের স্থাপনা উচ্ছেদসহ খননের সার্বিক রোডম্যাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পাউবো'কে দেখিয়ে দেন।
সূত্র জানায়, খনন কাজের ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা সাইট ভিজিটে আসেনি। এছাড়াও নদী খননের সাথে জড়িত কোন ব্যক্তিবর্গকেও অন্তত ৭ দিন খনন কাজের সাইডে গিয়েও পাওয়া যায়নি।
নদী খনন কাজ দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন,নদী খনন কাজ শুরু হওয়ায় আমরা আনন্দিত। কিন্তু খনন কাজের সাথে জড়িতদের ভূমিকায় আমরা সংশয়ে ও আস্থাহীনতায় রয়েছি। জানা মতে, তারা সঠিকভাবে এই কাজ দেখভাল করছে না। নদীর দুই পাড় দখলমুক্ত না করেই খনন কাজ চালানোর অপচেষ্টা লক্ষ্য করছি। বিত্তিপাড়া ঘোড়াশাহ্ মাজারের পূর্ব পাশে বেশ কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনা বাঁচিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও লক্ষ্য করছি। ঘোড়াশাহ মাজার হতে কাঠেরপুল হয়ে হিসনা ব্রীজ অভিমুখে আসতে অন্তত ৫০টি বাড়িসহ শতাধিক স্থাপনা নদীর মধ্যে রয়েছে। ইতিমধ্যেই কাঠেরপুল এলাকায় আবার নতুন করে অন্তত ৫-৭ টি বাড়ির ও স্থাপনার কাজ শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হযরত আলী জানান, নদীর কতটুকু খনন করা হবে, কোন ম্যাপ অনুসারে নদীর প্রবাহ চলবে, এটা পরিষ্কার নয়। হিসনা নদী খননের সার্বিক তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল হিসনা নদী দখল করে রেখেছে। নদীটির পৌর অংশে নির্মাণ করেছে স্থায়ী অট্টালিকা, নদীতে বাঁধ দিয়ে লিজের নামে ব্যক্তি মালিকানায় চলছে মাছচাষ আর শুকনো মৌসুমে চাষাবাদ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে হিসনা নদী প্রতিনিয়তই দখল হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ জেলা প্রশাসন একেবারেই নির্বিকার ছিল বলে অভিযোগ আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এক সময়ের খরস্রোতা নদীটি ভেড়ামারার পৌরসভাসহ ধরমপুর, জুনিয়াদহ, চাঁদগ্রাম,মোকারমপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। নদীটি দৌলতপুরের মুসলিমনগরে পদ্মা নদীর শাখা হিসেবে উৎপত্তি হয়ে মিরপুরের চাপাইগাছি বিলে পতিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৫২ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৪২ মিটার(গড় ৩০ মি)।ভেড়ামারা অংশে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫-২০ কি:মি: এবং এর শাখা নদীসহ আরো ২০ কি:মি:।
উপজেলার বিভিন্ন ভূমি অফিস থেকে পাওয়া তথ্যমতে,শহরের হিসনা ব্রিজ পয়েন্ট থেকে কাঠেরপুলের শেষ সীমানা পর্যন্ত ১৩৬০,১৩৬২,১৩৫৩,১৩৪০-৪১,
১৩২৪-২৫,১৩১৮,১৩১৬ দাগগুলো নদীর ভিতরে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ৫৩ ও ৬২ দাগ ব্যক্তি মালিকানায় অধিভুক্ত আছে। বাকি দাগ গুলো নদীর খাস জমি। যা অন্যরা চাষাবাদ ও ভোগ দখল করছে। জানা গেছে, ১৯৫৬-৫৭ সালে অনেকেই "স্থায়ী বন্দোবস্ত"(পিআর) এর মাধ্যমে নদীর জমি সরকারের থেকে লিজ নিয়ে ১৯৭৬ সালে আর. এস (রিভিশনাল সার্ভে) এর মাধ্যমে তা নিজ নামে রেকর্ড করে নিয়েছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়,হিসনা ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নদীর কিছু অংশের প্রস্থ ৪০ মিটার আছে।বাদবাকি অধিকাংশ জায়গায় তা কমে ১৫-২০ মিটারের মত আছে। পৌরসভার কাঠেরপুল অংশে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুপাশ দখল হয়ে প্রস্থ কমে সরু হয়ে নদী মরাখালে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ আছে, নদীর জায়গা দখল করে এই অংশেই নির্মিত হয়েছে অন্তত ২০-২৫ টি দালাল বাড়ি ও স্থাপনা। নদী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এখানে নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে 'কাঠেরপুল' ব্রীজ, যা নদীর প্রস্থের অর্ধেকেরও কম। হিসনা নদীর ওপর নির্মিত প্রায় প্রতিটি ব্রীজেই এই আইনকে অমান্য করা হয়েছে।
অতি সাম্প্রতিককালে নদীর জায়গা দখল করে মাটি ও বালু ফেলার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী,বিএনপি, জামায়াত নেতা ও তাদের আশীর্বাদপুষ্টদের বিরুদ্ধে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, হিসনা নদীর খনন কাজের জাস্ট প্রি-প্রিপারেশন শুরু হয়েছে। তাদেরকে শুধুমাত্র কাজের মুভিলাইজেশন করতে বলা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কাজ উদ্বোধনের পর সার্বিক মানচিত্রের ডিজাইন ,ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য,কতটুকু কিভাবে হবে তার পরিপূর্ণ তথ্য সাইনবোর্ড আকারে দেওয়া থাকবে। এছাড়াও নদীর পাড় থেকে ৩০ ফুটের মধ্যে কোন স্থাপনা করার নিয়ম নেই।
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আমিরুল আরাফাত জানান, আমি হিসনা নদী খননকার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে কাজ সঠিক হবে বলে আশ্বস্ত করেছে।