সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সরকারি সদর হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) নিয়ে অর্থ লেনদেন ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের মর্গে “লাশ নিয়ে ব্যবসা” বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রতন সেখ পিপিএম।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ মে ২০২৬, রোববার, সদর হাসপাতালের মর্গ এলাকায়। জানা যায়, ২৩ মে শনিবার ছাতক উপজেলার টেংগরাগাঁও গ্রামের রশিদ মিয়ার বাড়ির সামনে একটি খাল থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে ছাতক থানা পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন এসআই আনোয়ার হোসেন ও কনস্টেবল অমিত।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের মর্গে দায়িত্বে থাকা ডোম মনসুর আলী রাতেই মরদেহ রাখার জন্য টাকা দাবি করেন। পরদিন পোস্টমর্টেম করতে আরও অর্থ দাবি করা হয়। পরে ছাতক থানার এসআই আনোয়ার হোসেন অনুরোধ করে ১ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করেন বলে জানা যায়। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও ময়নাতদন্তের কাজ শুরু হয়নি। এ ছাড়া মরদেহ গোসল, কাফন ও দাফনের জন্য আরও ৯ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় বিপাকে পড়ে ছাতক থানা পুলিশ। পরে বিষয়টি জানানো হলে সদর থানার ওসি মো. রতন সেখ রোববার দুপুরে হাসপাতালে যান এবং ঘটনার সত্যতা পান বলে জানান। তিনি নিজ উদ্যোগে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করেন।
ওসি রতন সেখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দিলে মানবিক সাড়া মেলে। ৯ জন নারী স্বেচ্ছায় এসে মরদেহ গোসল ও কাফনের কাজে অংশ নেন। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স চালক ইমন বিনামূল্যে মরদেহ পরিবহনের দায়িত্ব নেন। স্থানীয় যুবকেরাও কবর খননে সহযোগিতা করেন।
সারাদিন হাসপাতালে অবস্থান করে সিলেট পিবিআইয়ের তদন্ত শেষে রাত ৮টার দিকে শান্তিবাগ মরাটিলা কবরস্থানে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করেন ওসি রতন সেখ। এসময় তিনি নিজ কাঁধে মরদেহ বহন করেন।
ওসি রতন সেখ বলেন, “একজন পরিচয়হীন নারীর বেওয়ারিশ লাশ পোস্টমর্টেম করতে টাকা ছাড়া কাজ হয় না—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবতা বলতে কিছু থাকা দরকার। আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেওয়ারিশ লাশের পোস্টমর্টেম ও দাফনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “ছাতক থেকে আসা পুলিশ সদস্যরা যে হয়রানির শিকার হয়েছেন, তা আমি নিজ চোখে দেখেছি। লাশঘরে মরদেহ রাখার জন্য ৭০০ টাকা, পোস্টমর্টেমের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং গোসল-কাফন ও দাফনের জন্য আরও টাকা দাবি করা হয়েছে। পরে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর মানবিক মানুষজন এগিয়ে আসেন। আমি তাদের প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ডোম মনসুর আলী বলেন, “আমি সরকারি কর্মচারী নই। একটি লাশ একা বহন করা সম্ভব না। সহযোগী লাগলে টাকা দিতে হয়। এছাড়া গলিত মরদেহের দুর্গন্ধ কমাতে কেরোসিন, পলিথিনসহ বিভিন্ন জিনিস বাইরে থেকে কিনতে হয়। হাসপাতাল থেকে এসব দেওয়া হয় না, তাই কিছু টাকা নিতে হয়।”
এ বিষয়ে সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান স্বপন বলেন, “বিষয়টি জেনে খারাপ লেগেছে। কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মনসুর আলী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করেন এবং নিয়মিত বেতন পান। ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাসপাতাল থেকেই সরবরাহ করা হয়। এরপরও যদি কেউ টাকা নিয়ে হয়রানি করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা নতুন ডোম নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করছি। লাশ নিয়ে কেউ বাণিজ্য করার চেষ্টা করলে তাকে রাখা হবে না। বেওয়ারিশ লাশ দাফনে মানবিক মানুষের অভাব হয় না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”