• ঢাকা
  • সোমবার , ৯ মার্চ ২০২৬ , সকাল ০৬:৪১
  • ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২
ব্রেকিং নিউজ
হোম / ফিচার

কিশোরীর প্রতারণা, ভাঙা স্বপ্ন ও শিক্ষা

রিপোর্টার : দৈনিক আলোর সকাল
কিশোরীর প্রতারণা, ভাঙা স্বপ্ন ও শিক্ষা ই-পেপার/প্রিন্ট ভিউ

আমি কিশোরী—১০ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এই বয়সে অনেক ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কিছু ভুলের শিক্ষা জীবনভর মনে থাকে। আমার নিজের গল্প, ভাঙা অনুভূতি, শেখা পাঠ—এগুলো শুধু আমার নয়, এটি হাজারো কিশোরী ও নারীর বাস্তবতার প্রতিফলন।

আমি সবসময় সত্য বলি, সত্য নিয়েই বাঁচতে চাই। বিশ্বাস করে ঠকেছি—এটাই আমার। তবুও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে নিজের শক্তি দেখাতে হবে। আমার কাহিনী শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি আমাদের সমাজের নারীদের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

এই বয়সটাই সবচেয়ে অদ্ভুত—কখনো রঙিন, কখনো ভীষণ অস্থির। আমি সবসময় একটু ছেলেমানুষী, কোনো বিষয়েই খুব সিরিয়াস ছিলাম না। প্রেমকে কখনো বিশ্বাস করিনি, কারণ ছোটবেলা থেকেই জানতাম—মায়া এক ভয়ংকর ফাঁদ। তবু জীবন এমনভাবে খেলা খেলল, যে একদিন আমিও ভেঙে পড়লাম। আমার মতো একরোখা, রাগী কিশোরী ভেবেছিলাম সহজে হার মানব না। কিন্তু যে মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম, সে আমাকে বাজেভাবে আঘাত করল। আজ আমি লজ্জিত আমার নিজের বিশ্বাসের কাছে। তবুও এক অদ্ভুত শান্তি পাই—কারণ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো, আমি ঠিকই ভেবেছিলাম।

হ্যাঁ, কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু শুধু আমি নই, পৃথিবীর সব মানুষই কষ্ট পায়। পার্থক্য হলো, এক বেকারের সঙ্গে হয়তো থাকা যায়, কিন্তু একজন বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে নয়। আর একজন নেশা-প্রবণ বা দায়িত্বহীন মানুষের সঙ্গে নয়—কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের ঠিকভাবে চেনে না, অন্যকে কখনো সম্মান দেবে না। যে কোনো কিছু ভাঙা বা গুঁড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু একটি সম্পর্ক বা জীবন গড়ে তোলা খুবই কঠিন।

আজকের যুগের কিশোরী ও নারীরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। তারা শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, কর্মজীবনে সক্রিয়। তবু সমাজে নানা সমস্যা এখনও রয়েছে। নিরাপত্তা, আর্থিক স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই লড়াই করতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নারীর প্রতি সহিংসতা ও মানসিক শোষণ। পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অসম বেতন, সাইবার বুলিং—প্রতিদিনের জীবনে এসব যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আইন থাকলেও ন্যায়বিচার পেতে নারীদের দীর্ঘ লড়াই করতে হয়।

একটি ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো প্রেমের নামে প্রতারণা। কিছু পুরুষ মিষ্টি কথা, প্রতিশ্রুতি বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে মেয়েদের বিশ্বাসে ফাঁদ পায়। লক্ষ্য পূরণ হলে তারা দূরে সরে যায়। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আবেগের শোষণ, সামাজিক দোষারোপ—সবই কিশোরী ও মেয়েদের জীবনকে অস্থিতিশীল করে তোলে। যারা এত চাহিদা পূরণ করতে চায়, তাদের জন্য অনেক জায়গা আছে—তাহলে কেন কিছু মেয়েকে মায়ায় ফেলে তাদের জীবন নষ্ট করো? প্রেমের নামে অন্যকে ভাঙা সহজ, কিন্তু একটি জীবন গড়ে তোলা কঠিন। এই ধরনের প্রতারণার জন্য অবশ্যই আইনের হাত শক্ত হতে হবে।

একটা পবিত্র বন্ধনকে অপবিত্র করছে এমন মানুষগুলোর জন্য হাজারো শিশু প্রতিদিন কষ্ট ভোগ করছে। জন্ম জন্ম ধরে রাস্তাঘাটে ফেলে চলে যায় তারা। অনেকেই ভাবেই, একটি শিশুর জন্য কতটা ত্যাগ করতে হয়, কতটা কষ্ট নিতে হয়। কিন্তু সেই সুযোগ তারা পান না। শিশুরা অপেক্ষা করে স্নেহ, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার জন্য। অথচ কেউ তা দেয় না। এই অবহেলা ও শোষণ শুধু শিশুদের জীবনকে কলঙ্কিত করে না, পুরো সমাজকেও নষ্ট করে।

আজকের দিনে অনেক কিশোরী ধর্ষিত হচ্ছে কিন্তু বলতে পারছে না। সমাজের ভয়, চাপ এবং ক্ষমতার দমনে তারা আইনের সাহায্য নিতে পারছে না। ভালোবাসা কখনোই যাবে না, আর ঘুষখোর বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কখনোই সহজে বিদায় নেবে না। আপনি যতই ক্ষমতাশালী হোন, অনেকেই তা অপব্যবহার করবে। আগে আপনি যে ছিলেন বা ছিলেন না—সব ভুলে যাবেন, কিন্তু অন্যের জীবন ধ্বংস করা চালিয়ে যাবেন।

আরও ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো, অনেক কিশোরী প্রেমের ফাঁদে পড়ে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়। তাদের বিরুদ্ধে হুমকি, গোপনীয়তা প্রকাশের ভয় এবং মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। অনেক সময় তারা কাউকে কিছু বলতে পারে না। এই চাপের কারণে অনেকে আত্মহত্যার পথেও ঠেলে দেওয়া হয়। একমাত্র অপরাধ তাদের বিশ্বাস করা এবং ভালোবাসার জন্য খোলা মন রাখা।

পিরিয়ড বা মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কেউ প্রকাশ্যে লেখে না। অনেকেই লজ্জা বা ভয়ের কারণে এই বিষয়কে এড়িয়ে যায়। ফলে সমস্যাগুলো অজানা থেকে যায়, এবং অসহায় কিশোরী ও নারী কার্যকর সাহায্য পায় না। দেশের অনেক মেয়ের জন্য স্যানিটারি প্যাডের অভাব রয়েছে।

হ্যাঁ, ভারত ও নেপালে কিছু স্যানিটারি প্যাড সরকার বা এনজিও উদ্যোগে খুব কম দামে বা প্রায়几 টাকা দরে বিক্রি করা হয়।

ভারতে উদাহরণ:

ভারত সরকার বা কিছু এনজিও উদ্যোগে “सस्ती सैनेटरी नैपकिन” বা “Low-cost Sanitary Pads” প্রোগ্রাম চালানো হয়।

স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটি সেন্টারে প্রতি প্যাড ১–৫ রুপি (প্রায় ১–৫ টাকা) দরে বা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

নেপালে উদাহরণ:

“Free sanitary pad program” এবং কিছু NGO স্কুলে বিনামূল্যে প্যাড বিতরণ করে।

স্থানীয়ভাবে কিছু কম দামের প্যাড ৫০ পয়সা–২ রুপি দরে পাওয়া যায়।

এভাবে, ভারত ও নেপালে পিরিয়ডের প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনেক সুলভে বা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশে একই সামগ্রী অনেক বেশি মূল্যে (১০০–৩০০ টাকা) বিক্রি হয় এবং সব শিক্ষার্থী বা দরিদ্র মেয়েদের হাতে পৌঁছায় না। বিশেষ করে যারা ‘দিনে দিনে’ কাজ করে—দিনমজুর বা দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল—তারা কীভাবে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাবে? অনেক সময় তারা কাপড় ব্যবহার করে, যার ফলে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণে অনেক মেয়ে মা হওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। সরকার চাইলে সহজেই এই প্যাড বিনামূল্যে বিতরণ করতে পারে, কিন্তু মৌলিক স্বাস্থ্যসুবিধা এখনও সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

সমাধান ও প্রস্তাব

1. স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার বা গ্রামে স্যানিটারি প্যাড বিনামূল্যে বিতরণ করা আবশ্যক, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী সহজে পায়।

2. মোবাইল বা ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া।

3. স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তায় কম খরচে উৎপাদন বাড়ানো, যাতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়।

4. অনলাইন অর্ডার ও স্থানীয় বিতরণ পয়েন্টে সহজে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

5. সরকার, এনজিও ও কমিউনিটির অংশীদারিত্বে নিশ্চিত করা, যেন কেউ বাদ না পড়ে এবং মেয়েরা স্বাস্থ্যসুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়।

অনেকেই লেখালেখি করে সমাজের বিভিন্ন বিষয় ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু নারীর বাস্তবতা, তাদের ভাঙা স্বপ্ন, স্বাস্থ্য সমস্যা বা প্রতারণার কাহিনী নিয়ে খুব কম মানুষ লিখে। এই বিষয়গুলো সামনে আনা জরুরি, যেন সচেতনতা সৃষ্টি হয় এবং নারীরা নিজের অধিকার ও স্বপ্নের জন্য লড়তে পারে।

প্রেম সুন্দর, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস নয়। যখন নারী নিজের শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও আত্মসম্মানকে প্রথমে রাখে, তখন কোনো প্রতারণা তাকে ভাঙতে পারে না। নারীর শক্তি কেবল তার ভালোবাসায় নয়—তার সাহস, স্বপ্ন ও স্বাধীনতায়। যে ভালোবাসা সম্মান ও নিরাপত্তা দেয় না, তা কোনো প্রেম নয়—এটা শোষণ।

আমি চাই প্রতিটি কিশোরী একবার হলেও আমার লেখা পড়ুক। আমি যে ভুল করেছি, আমার ভুল থেকে তোমরা শিক্ষা নিও। নিজের স্বপ্ন, শিক্ষা এবং মর্যাদা আগে রাখো। কেউ তোমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে খেলবে না—তোমার নিজের শক্তি থাকলে কেউ তোমাকে ভাঙতে পারবে না। আর যারা অন্যকে বিপন্ন করে, তাদের জন্য আইনের কঠোর শাস্তি থাকা অবশ্যই জরুরি, যাতে সমাজের কিশোরী ও নারীরা নিরাপদ ও সুরক্ষিত জীবন পায়।

এ গল্প শুধু আমার নয়, এটি আমার বয়সী অনেক কিশোরীরও গল্প। যারা ভুল করে, যারা ভাঙগে আবার ঘরে উঠে.. লেখা ফাইজা রহমান অনু


ফিচার

আরও পড়ুন