– ফাইজা রহমান অনুবাংলাদেশের সামাজিক কথোপকথনে একটি কথা প্রায়শই শোনা যায়—“গ্রামের মানুষ সহজ-সরল।” এ কথা আমরা শুনি রাজনৈতিক বক্তৃতায়, সিনেমার সংলাপে, সাহিত্য-নাটকে কিংবা শহুরে চায়ের দোকানের আড্ডায়। প্রথম শ্রবণে এটি নিরীহ ও প্রশংসাসূচক মনে হলেও, বাস্তবে এই বাক্যটি বহন করে এক ধরনের শ্রেণিপরিচালিত ও বৈষম্যমূলক মানসিকতা। এটি কেবল একটি ভাষাগত রূপ নয়, বরং একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে গোটা একটি জনগোষ্ঠীকে নিরুত্তর, নিরীহ এবং প্রান্তিক করে তোলা হয়।“সহজ-সরল” বলা মানেই কি তা ইতিবাচক? নাকি এটি একটি প্রকারান্তরে বোবা, অচালিত, অরাজনৈতিক এবং দমনযোগ্য শ্রেণিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়? গ্রামীণ মানুষেরা কি সত্যিই সহজ? নাকি তারা কৌশলী, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন এবং প্রতিকূলতায় অভ্যস্ত এক বুদ্ধিমান জনগোষ্ঠী? এই প্রশ্নগুলো করা জরুরি, কারণ এ ধরনের বাক্য আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরকার বৈষম্যকে আলগা করে না, বরং আরও দৃঢ় করে তোলে।গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিদিন যে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে, তা শহুরে সমাজের অনেকেই কল্পনা করতে পারে না। তারা লড়াই করে মৌলিক চাহিদার জন্য, প্রকৃতির অনিয়মের বিরুদ্ধে, সেবা ও সুবিধার অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে। একজন কৃষক ফসল ফলানোর জন্য যে পরিমাণ প্রাকৃতিক জ্ঞান, সময়ানুভূতি, বাজারচিন্তা ও টিকে থাকার কৌশল প্রয়োগ করেন, তা কোনোভাবেই “সহজ-সরল” তকমায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।তবে এই বাক্যটির মাধ্যমে অনেক সময়ই রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করা হয়। একে ব্যবহার করে ক্ষমতাবান শ্রেণি গ্রামীণ জনতাকে ‘নিরীহ ভোটব্যাংক’ হিসেবে চিত্রিত করে, যাদের চাহিদা কম, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ নেই, যাদের শুধু একটু সহানুভূতি দেখালেই তারা মুগ্ধ হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু গ্রামীণ জনগণ অত্যন্ত রাজনৈতিক, তাদের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা আছে, অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে।এই কথাটি সমাজে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, এটি নিয়ে প্রশ্ন করাও যেন ‘অসৌজন্যমূলক’। কিন্তু এই প্রশ্ন তোলাটাই এখন জরুরি। কারণ সমাজে প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে তার যোগ্য সম্মান দেওয়া, তার সংগ্রাম ও চিন্তাশক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া—এটাই ন্যায়ের কথা। “সহজ-সরল” বলে গ্রামীণ মানুষের চেতনা, প্রতিরোধ এবং প্রতিভাকে ঢেকে ফেলা যায় না।গ্রাম মানে কেবল কাদামাটির পথ নয়, গ্রাম মানে ইতিহাস, ঐতিহ্য, চাষাবাদ, সহনশীলতা আর প্রতিদিনের টিকে থাকার এক মহাবিদ্যালয়।সুতরাং, “গ্রামের মানুষ সহজ-সরল”—এই বাক্যটি যতই পরিচিত হোক, তা আসলে সমাজের একটি গভীর অবজ্ঞা ও শ্রেণি-বিভেদের প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করার, ভাঙার এবং নতুন করে ভাবার। কারণ মানুষকে শ্রেণি অনুযায়ী 'সহজ' বা 'চতুর' বলে বিচার করা মানেই তার সত্যিকার অবস্থান, জ্ঞান ও মানবিক সংগ্রামকে অস্বীকার করা।
প্রকাশিত : বুধবার , ২১ মে ২০২৫ , সকাল ০৯:১৩।।
প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার , ১৫ মার্চ ২০২৬ , দুপুর ০২:৫৫
“গ্রামের মানুষ সহজ-সরল”—একটি শ্রেণিচিন্তার ভ্রান্ত প্রতিফলন
– ফাইজা রহমান অনুবাংলাদেশের সামাজিক কথোপকথনে একটি কথা প্রায়শই শোনা যায়—“গ্রামের মানুষ সহজ-সরল।” এ কথা আমরা শুনি রাজনৈতিক বক্তৃতায়, সিনেমার সংলাপে, সাহিত্য-নাটকে কিংবা শহুরে চায়ের দোকানের আড্ডায়। প্রথম শ্রবণে এটি নিরীহ ও প্রশংসাসূচক মনে হলেও, বাস্তবে এই বাক্যটি বহন করে এক ধরনের শ্রেণিপরিচালিত ও বৈষম্যমূলক মানসিকতা। এটি কেবল একটি ভাষাগত রূপ নয়, বরং একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে গোটা একটি জনগোষ্ঠীকে নিরুত্তর, নিরীহ এবং প্রান্তিক করে তোলা হয়।“সহজ-সরল” বলা মানেই কি তা ইতিবাচক? নাকি এটি একটি প্রকারান্তরে বোবা, অচালিত, অরাজনৈতিক এবং দমনযোগ্য শ্রেণিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়? গ্রামীণ মানুষেরা কি সত্যিই সহজ? নাকি তারা কৌশলী, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন এবং প্রতিকূলতায় অভ্যস্ত এক বুদ্ধিমান জনগোষ্ঠী? এই প্রশ্নগুলো করা জরুরি, কারণ এ ধরনের বাক্য আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরকার বৈষম্যকে আলগা করে না, বরং আরও দৃঢ় করে তোলে।গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিদিন যে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে, তা শহুরে সমাজের অনেকেই কল্পনা করতে পারে না। তারা লড়াই করে মৌলিক চাহিদার জন্য, প্রকৃতির অনিয়মের বিরুদ্ধে, সেবা ও সুবিধার অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে। একজন কৃষক ফসল ফলানোর জন্য যে পরিমাণ প্রাকৃতিক জ্ঞান, সময়ানুভূতি, বাজারচিন্তা ও টিকে থাকার কৌশল প্রয়োগ করেন, তা কোনোভাবেই “সহজ-সরল” তকমায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।তবে এই বাক্যটির মাধ্যমে অনেক সময়ই রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করা হয়। একে ব্যবহার করে ক্ষমতাবান শ্রেণি গ্রামীণ জনতাকে ‘নিরীহ ভোটব্যাংক’ হিসেবে চিত্রিত করে, যাদের চাহিদা কম, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ নেই, যাদের শুধু একটু সহানুভূতি দেখালেই তারা মুগ্ধ হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু গ্রামীণ জনগণ অত্যন্ত রাজনৈতিক, তাদের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা আছে, অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে।এই কথাটি সমাজে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, এটি নিয়ে প্রশ্ন করাও যেন ‘অসৌজন্যমূলক’। কিন্তু এই প্রশ্ন তোলাটাই এখন জরুরি। কারণ সমাজে প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে তার যোগ্য সম্মান দেওয়া, তার সংগ্রাম ও চিন্তাশক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া—এটাই ন্যায়ের কথা। “সহজ-সরল” বলে গ্রামীণ মানুষের চেতনা, প্রতিরোধ এবং প্রতিভাকে ঢেকে ফেলা যায় না।গ্রাম মানে কেবল কাদামাটির পথ নয়, গ্রাম মানে ইতিহাস, ঐতিহ্য, চাষাবাদ, সহনশীলতা আর প্রতিদিনের টিকে থাকার এক মহাবিদ্যালয়।সুতরাং, “গ্রামের মানুষ সহজ-সরল”—এই বাক্যটি যতই পরিচিত হোক, তা আসলে সমাজের একটি গভীর অবজ্ঞা ও শ্রেণি-বিভেদের প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করার, ভাঙার এবং নতুন করে ভাবার। কারণ মানুষকে শ্রেণি অনুযায়ী 'সহজ' বা 'চতুর' বলে বিচার করা মানেই তার সত্যিকার অবস্থান, জ্ঞান ও মানবিক সংগ্রামকে অস্বীকার করা।