ই-পেপার/প্রিন্ট ভিউ
স্টাফ রিপোর্টার রংপুর।
আগামী (২২ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় রংপুর সার্কিট হাউজে “জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের ৫ জন শহীদ সাংবাদিক পরিবারকে সম্মাননা” দিবে বলে জানিনাছে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা। রংপুর জেলা,মহানগর ও বিভাগীয় কমিটির আয়োজনে এই সম্মাননা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন মেহেদীসহ ৫ জন সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে তিনজন শহীদ হয়েছেন রাজধানী ঢাকায়; ১জন সিলেটে, আরেকজন হবিগঞ্জে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে শহীদহন মেহেদী হাসান, উত্তরায় শাকিল হোসেন ও ধানমন্ডিতে তাহির জামান।
এ ছাড়া সিলেট শহরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হন সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব আর হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে শহীদ হন সোহেল আখঞ্জী।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারা দেশে শহীদ হয়েছেন ৮৪৪ জন। এ তালিকায় শহীদ পাঁচ সাংবাদিকের নাম রয়েছে।
তিন ভাইয়ের মধ্যে মেহেদী হাসান (৪০) ছিলেন বড়। ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনাসহ পরিবারের অন্যান্য খরচ তিনিই বহন করতেন। কেরানীগঞ্জের এক কক্ষের বাসায় থাকতে অসুবিধা হতো। কথা ছিল পরের মাসে (আগস্ট ২০২৪) তাঁরা দুই কক্ষের একটি বাসায় উঠবেন। কিন্তু তা আর হয়নি।
মেহেদীর বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলে। তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম দুই মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে থাকেন। মেহেদী যখন শহীদ হন, তখন বড় মেয়ের বয়স ছিল সাড়ে তিন বছর। আর ছোট মেয়ে ছিল সাত মাস বয়সী। স্বামীকে হারিয়ে বিপর্যস্ত এই নারী বললেন, ‘মাথার ওপরে যে বটগাছটা ছিল, সেটা এখন নেই।’ শাকিলকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বাবা (১৮ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর থানার সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক শাকিল হোসেন। পুলিশের ছোড়া গুলি তাঁর বুকে বিদ্ধ হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ২৩ বছর বয়সী শাকিল মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনিক ভোরের আওয়াজ–এর গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায়। শাকিলের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায়। তাঁর বাবা মো. বেলায়েত হোসেন ব্যবসা করেন। ৩ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে শাকিল ছিলেন সবার ছোট। আক্ষেপ নিয়ে দিন কাটছে তাহিরের মায়ের
১৯ জুলাই বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির গ্রিন রোডে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন ২৭ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী তাহির জামান (প্রিয়)। হঠাৎ পুলিশের গুলি এসে লাগে তাঁর মাথায়।
সে সময় ওই এলাকার আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশ অনবরত গুলি করছিল। ফলে আশপাশে থাকা ছাত্র-জনতা তাঁকে উদ্ধার করতে পারেননি। পরে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে তাঁর মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। তাহিরের গ্রামের বাড়ি রংপুরে। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে সাবিরা জামান এখন দাদি ও মায়ের সঙ্গে ঢাকায় আছে। বিয়ের দুই মাসের মাথায় মৃত্যু তুরাবের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন দৈনিক নয়াদিগন্ত-এর সিলেট ব্যুরোপ্রধান আবু তাহের মো. তুরাব। পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হন তুরাব। সেদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তুরাব ছিলেন সবার ছোট। গত বছরের ১২ মে লন্ডনপ্রবাসী তানিয়া ইসলামের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন ৩৪ বছর বয়সী তুরাব। বিয়ের মাত্র দুই মাস ছয় দিনের মাথায় তিনি শহীদ হন। সোহেলের মৃত্যুতে বিপর্যস্ত পরিবার ৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার এল আর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সমবেত হন কয়েক ১০০শত শত শিক্ষার্থী। এরপর বের করা হয় মিছিল। মিছিলটি বড়বাজার হয়ে থানার সামনে দিয়ে রওনা হয়। পথে ঈদগাঁ এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাতে বাধা দেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো হয়।
গুলিতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন শহীদ হন। তাঁদের একজন ৩৫ বছর বয়সী সাংবাদিক সোহেল আখঞ্জী। তিনি স্থানীয় দৈনিক লোকালয় বার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক। সংবাদ সংগ্রহের কাজে ঘটনাস্থলে ছিলেন সোহেল।স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন সোহেল আখঞ্জী। তাঁর মা–বাবা আগেই মারা গেছেন। সোহেলের কোনো ভাই-বোন নেই। তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা বানিয়াচংয়েই থাকেন।