নওগাঁ আদালতে দায়ের হওয়া একটি মানহানি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’। সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে সাংবাদিক মহল, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন স্তরে উদ্বেগ ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বাদী নওগাঁ সদর উপজেলার খাস নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম শফিক। আদালতে দায়ের করা অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কারণে তার সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত সুনাম এবং পেশাগত অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ অভিযোগে তিনি নওগাঁর মুখ্য আমলি আদালতে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৫০৯ ধারায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এম এ মমিন আনসারী বলেন, প্রকাশিত সংবাদটি কোনোভাবেই ভিত্তিহীন নয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্য গ্রহণের পরই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “বাদীর বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। জনস্বার্থে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষার দায়বদ্ধতা থেকেই সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইসঙ্গে জনস্বার্থে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পরিচালনা ও তথ্য প্রকাশ করা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। কোনো অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে চাপ সৃষ্টি করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চার জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াবে।”
এম এ মমিন আনসারীর দাবি, “এই মামলাটি প্রকৃতপক্ষে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের একটি অপচেষ্টা। দুর্নীতি, প্রতারণা, অনিয়ম ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে গণমাধ্যমকে আইনি হয়রানির মুখে ফেলা হলে ভবিষ্যতে সত্য অনুসন্ধানে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা বিচার বিভাগের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং আদালতের প্রতি আস্থাশীল। আদালতে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তবে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা ও হয়রানির প্রবণতা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অবাধ সংবাদপ্রবাহের জন্য উদ্বেগজনক।”
এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহলের অনেকেই মনে করছেন, জনস্বার্থে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার জবাব তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে দেওয়া উচিত। সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা যেন সাংবাদিকদের ন্যায়সঙ্গত অনুসন্ধানী কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা এবং প্রকাশিত সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে। তবে এরই মধ্যে মামলাটিকে ঘিরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মন্তব্য করুন