দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য প্রতিকূলতা, সীমিত আয়ের সংসার এবং নিরলস চিকিৎসা—সবকিছু পেরিয়ে অবশেষে কন্যাসন্তানের মা হয়েছেন নান্দাইলের ফারজানা। এ ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি পোস্ট দিয়েছেন সিবিএমসিবির প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শিলা সেন।
ডা. শিলা সেন জানান, ফারজানার সম্মতি নিয়েই তিনি তার সংগ্রামের গল্প ও একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। পোস্টের শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেন, “ম্যাডাম, আমার গল্পটা কিন্তু আপনি ফেসবুকে লিখবেন”—ফারজানার এই অনুরোধের পরই তিনি তার গল্প সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন।
জানা যায়, নান্দাইলের বাসিন্দা ফারজানার বিয়ের নয় বছর পার হলেও তিনি সন্তানের মুখ দেখেননি। তার স্বামী একজন রিকশাচালক এবং অতি সীমিত আয়ে সংসার চালান। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ২০২৩ সাল থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসতেন।
ডা. শিলা সেন তার পোস্টে জানান, সন্তান জন্মের পর লেবার টেবিলেই ফারজানা তাকে বলেন, “আমি ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা করে টাকা জমিয়ে আপনার কাছে চিকিৎসা করতে আসতাম। আপনি কোনোদিন আমাকে ফিরিয়ে দেননি। আজ আমার কোলে সন্তান এসেছে—এটা শুধু আল্লাহর রহমত আর আপনার জন্য।”
এই কথাগুলো শুনে নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বলে উল্লেখ করেন তিনি। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, ফারজানা দীর্ঘদিন ধরে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOD)-এ ভুগছিলেন। অনেক চেষ্টার পর একবার গর্ভধারণ করলেও তা গর্ভপাত হয়ে যায়। এরপর পুনরায় চিকিৎসা, ধৈর্য ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আবারও গর্ভধারণ করেন তিনি।
তবে গর্ভাবস্থার ২৯ সপ্তাহে তার পানি ভেঙে যাওয়ায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা অপরিণত শিশুর ফুসফুসের পরিপক্বতা নিশ্চিত করতে স্টেরয়েডসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর শ্রীকান্ত হাসপাতালে ফারজানা স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।
নবজাতকটি অপরিণত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিবিএমসিবির নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা আশা প্রকাশ করেছেন, যথাযথ পরিচর্যায় শিশুটি দ্রুত সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরে আসবে।
ডেলিভারির পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ফারজানা চিকিৎসকের পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলে ডা. শিলা সেন তাকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, “এখন তোমার বিশ্রাম দরকার। তোমার আর তোমার মেয়ের সুস্থ থাকাই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।”
পোস্টের শেষাংশে ডা. শিলা সেন লিখেছেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, চিকিৎসকরা শুধু রোগীর চিকিৎসাই করেন না; প্রতিটি মায়ের সংগ্রাম থেকে মানবিকতার শিক্ষা নেন। তিনি ফারজানা ও তার নবজাতক কন্যার দ্রুত সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি প্রকাশের পর অসংখ্য মানুষ ফারজানা ও তার নবজাতকের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন এবং চিকিৎসকের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।
মন্তব্য করুন