বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বাইরের শিক্ষার্থীদেরও পাঠদান, তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের
বেলাল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ছুটির পর কোচিং করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, লাইট ও ফ্যান। কোচিংয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি উপজেলার ঢোলারহাট ইউনিয়নের আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। বিদ্যালয়টির নির্ধারিত ছুটির সময় বিকেল ৪টা। অভিযোগ রয়েছে, ছুটির পর বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দুটি শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন একজন শিক্ষক। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই শিক্ষক নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, বাইরে থেকে এসেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দু-একজন ছাড়া কোচিংয়ে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বাইরের।
পরে ওই শিক্ষক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দুলাল রব্বানীকে ফোন করেন। খবর পেয়ে তিনিও বিদ্যালয়ে আসেন। এ সময় দুলাল রব্বানী জানান, সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। তাই শিশুরা এদিক-সেদিক ঘুরে না বেড়িয়ে তাদের পড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জুলফিকার রহমান অবগত আছেন বলেও তিনি জানান।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১০ মার্চ এক অফিস আদেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ছুটির পর কিংবা বন্ধের দিনে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানো নিষিদ্ধ করে। ওই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিংয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দায়ী থাকবেন।
অধিদপ্তরের এমন নির্দেশনার পরও আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কীভাবে কোচিং কার্যক্রম চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুদের পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত। সেখানে নির্ধারিত সময়ের বাইরে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে কোচিং করানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও এমন কার্যক্রম চলার বিষয়টি উদ্বেগজনক।
তাঁদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, লাইট ও ফ্যান ব্যক্তিগত বা কোচিংয়ের কাজে ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছেন? সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার দায়ভার কে নেবেন? কারণ বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিলও সরকারি অর্থে পরিশোধ করা হয়।
স্থানীয়রা আরও বলেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদানের জন্য। এসব সম্পদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোচিং পরিচালনার কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে কোচিং পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
এর আগে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরে তিনি ওই নোটিশের জবাব দেন বলে জানিয়েছিলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন।
তবে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
গত ২৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে দ্রুত নিষ্পত্তি এবং গৃহীত ব্যবস্থা কমিশনকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। অন্যদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছিলেন, জুলফিকার রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর জানা মতে, শিক্ষক ওই নোটিশের জবাব দিয়েছেন। তবে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশসংক্রান্ত চিঠি তিনি তখনো পাননি।
বিদ্যালয়ে কোচিং পরিচালনার বিষয়ে জানতে সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জুলফিকার রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে কোচিং পরিচালনার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
মন্তব্য করুন