শিক্ষক কেবল একটি পেশার নাম নয়, শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর, আলোকিত সমাজ নির্মাণের পথপ্রদর্শক। তাঁদের হাত ধরেই একটি শিশু স্বপ্ন দেখতে শেখে, জ্ঞানের আলোয় নিজের জীবনকে আলোকিত করে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে গড়ে তোলে।
সেই মহান শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে নারায়ণগঞ্জে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর (শনিবার) এইচডব্লিউপিএল (HWPL) ও বিএইচডিএস (BHDS) অপরাধ প্রতিরোধ কল্যাণ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় বাগে জান্নাত মসজিদসংলগ্ন আঙ্গুরা শপিং কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় অবস্থিত একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিএইচডিএস অপরাধ প্রতিরোধ কল্যাণ সংস্থা ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি সেলিনা সুলতানা শিউলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কর কমিশনার মর্তুজা শরিফুল ইসলাম রানা।
অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোমেন ইসলাম।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউননেচ্ছা। তিনি বলেন, শিক্ষকরাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মান তাঁকে আজও আবেগাপ্লুত করে। নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী জনপদে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে সমাজকে এগিয়ে নিতে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে আজীবন কাজ করে যেতে হবে।
প্রধান অতিথি কর কমিশনার মর্তুজা শরিফুল ইসলাম রানা বলেন, নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করতে পেরে তিনি গর্বিত। মানবসেবা ও সমাজ উন্নয়নে এইচডব্লিউপিএল এবং বিএইচডিএস অপরাধ প্রতিরোধ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার চেয়েও শিক্ষক পরিচয়ে নিজেকে বেশি সম্মানিত মনে করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের সম্পৃক্ত করে সংগঠনগুলোর মানবিক কার্যক্রম বিশ্বদরবারে সুনাম বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক, সংগঠক ও সমাজসেবক ফয়সাল আজম অপু। শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন,
“শিক্ষক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি আমাদের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এবং নিজেদের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। আজ আমরা যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান রয়েছে।
মা-বাবা আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, আর শিক্ষক আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে সেই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কীভাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হয় এবং কীভাবে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হয়।
আমার নিজের জীবনেও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনুভূতি অনেক গভীর। আমার বাবা একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০২১ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। বাবাকে হারানোর শূন্যতা আজও আমাকে কষ্ট দেয়। তবে তাঁর শিক্ষকতার জীবন, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার স্মৃতি আমার হৃদয়ে চিরজাগরূক।
একজন শিক্ষকের সন্তান হিসেবে আমি উপলব্ধি করি, শিক্ষকতা শুধু জীবিকা অর্জনের পেশা নয়; এটি একটি মহান দায়িত্ব, একটি আদর্শ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক পবিত্র অঙ্গীকার।
একজন শিক্ষক হয়তো শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকে সারাজীবন। অনেক সময় একজন শিক্ষকের বলা ছোট্ট একটি কথা, দেওয়া সামান্য উৎসাহ কিংবা স্নেহমাখা একটি পরামর্শও একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষকদের অবদানকে শুধু একটি দিবসের আলোচনা কিংবা সম্মাননা স্মারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
আমি মনে করি, যে সমাজ শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে আলোকিত হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। আর যে জাতি তার শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করে, সেই জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে না। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, কর্মপরিবেশ ও যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
আজকের এই আয়োজনের মাধ্যমে যেসব গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। একই সঙ্গে আয়োজক সংগঠন এইচডব্লিউপিএল ও বিএইচডিএস অপরাধ প্রতিরোধ কল্যাণ সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই, শিক্ষকদের সম্মানিত করার পাশাপাশি মানবিকতা, সম্প্রীতি ও সমাজকল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে অঙ্গীকার করি—শিক্ষকদের সম্মান করব শুধু কথায় নয়, কাজে; তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব শুধু বিশেষ দিনে নয়, প্রতিদিনের আচরণে। আমাদের সন্তানদের শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতে শেখাব, শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াব এবং একটি মানবিক, নৈতিক ও আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করব।
আমার প্রয়াত বাবাসহ পৃথিবীর সব প্রয়াত শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একই সঙ্গে জীবিত সব শিক্ষককে জানাই আন্তরিক সালাম, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবন, সমৃদ্ধ হোক আমাদের সমাজ, এগিয়ে যাক প্রিয় বাংলাদেশ।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএইচডিএস অপরাধ প্রতিরোধ কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হাসনা হেনা সুইটি, ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. পারভিন আক্তার, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মুফতি ডা. হোসাইন মোহাম্মদ আল আমিন, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি হাজী মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তা বেগম, নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক সামিরা সিদ্দিকী, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছায়ানুর তালুকদার, ফতুল্লা থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসিনা আক্তার কাজল, হিলফুল ফুযুল শান্তি সংঘের সভাপতি মাহতাব হোসেন, কাজী শফিউল আলম কালাম, আফছার আহমেদ, কবি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান সেলিম, নীলা আহমেদ নিশি, সকাল নারায়ণগঞ্জ ডটকমের জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক জামাল তালুকদার, নারায়ণগঞ্জ সদর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকলিমা আক্তার রুমা, নাজমা আক্তার কলি, তাসলিমা আক্তার, বন্দর থানা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দিন দেওয়ান, নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কবির হোসেন, শিক্ষক ফখরুদ্দিন, শিক্ষক মো. সানা উল্লাহসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
আলোচনা সভা শেষে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণী শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা।
শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
মন্তব্য করুন