দীর্ঘ দুই দশকের পুলিশি জীবনে এক ব্যতিক্রমধর্মী মানবিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলো নওগাঁ জেলা পুলিশ। ছিনতাই হওয়া একমাত্র জীবিকার অবলম্বন অটোরিকশা উদ্ধার করে অসহায় ও প্রতিবন্ধী এক পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়েছে জেলা পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অটোরিকশা ফিরে পেয়ে পুরো পরিবার পুলিশ সুপারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাতে ফুল নিয়ে তাঁর কার্যালয়ে হাজির হলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
জানা যায়, গত ১১ জুন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা রামকৃষ্ণ সরকার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে জানান, ১০ জুন সকালে দুর্বৃত্তরা তাঁর ছেলে রকিকে ডাবের পানির সঙ্গে বিষাক্ত কিছু খাইয়ে অচেতন করে পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস অটোরিকশাটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়।
বিষয়টি জানার পর পুলিশ সুপার তাৎক্ষণিকভাবে ভুক্তভোগীকে নওগাঁ সদর থানায় মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। মামলা রেকর্ড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে নওগাঁ সদর থানা ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
তদন্তকারী দল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কয়েকদিনের নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে চক্রটিকে শনাক্ত করে। পরে বগুড়া, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং ছিনতাই হওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। আদালতের নির্দেশক্রমে গত সপ্তাহে উদ্ধারকৃত অটোরিকশাটি দ্রুততম সময়ে প্রকৃত মালিক রামকৃষ্ণ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অটোরিকশা ফিরে পাওয়ার পর আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন রামকৃষ্ণ সরকার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে সোমবার তাঁরা উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাসহ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। সঙ্গে ছিলেন রামকৃষ্ণের বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তান। তাঁরা ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে জেলা পুলিশ ও পুলিশ সুপারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জানা যায়, কয়েক বছর আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রামকৃষ্ণ সরকার শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন। বর্তমানে তাঁর শরীরে ক্যাথেটার সংযুক্ত থাকায় তিনি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারেন না।
বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নিজেই নিচে নেমে এসে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন।
এ সময় আবেগাপ্লুত পুলিশ সুপার বলেন, মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আস্থা নওগাঁ জেলা পুলিশের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।
বিদায়ের সময় রামকৃষ্ণ সরকারের বৃদ্ধ মা পুলিশ সুপারের মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন এবং নওগাঁ জেলা পুলিশের সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করেন। মানবিক এই মুহূর্তটি উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে যায় এবং পুলিশ-জনতার পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
মন্তব্য করুন