সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে, যার ফলে এলাকাবাসী অসন্তুষ্ট। বিদ্যালয়টির ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে পাসের হার কম হয়েছে বলে এলাকা বাসীর দাবি। ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এইবছর বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে মাত্র ৯৭ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ১১৫ জন। পাসের হার ৪৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী। ফলাফল প্রকাশের পর বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা নিয়ে অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা না থাকায় পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অভিভাবক মাসুক মিয়া বলেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠে ক্লাসের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর কোনো বাধা-নিষেধ নেই। ফলে তারা পড়াশোনা থেকে বিমুখ হচ্ছে। নিয়মিত পাঠদান ও শৃঙ্খলার অভাবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান ফল বিপর্যয়ের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় আট থেকে নয়টি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদেরও প্রভাবশালীদের চাপের কারণে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো হয়েছে। বিদ্যালয়ে ক্লাসের হার কমে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদ্যালয় সঠিক সময়ে শুরু ও ছুটি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।ফলাফল প্রকাশের পরপরই বিদ্যালয়ে জরুরি সভা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যাওয়া রোধে কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে বলে তিনি জানান। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে প্রশাসন, বিদ্যালয়ের এমন ফলাফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও জনি রায় বলেন , নিম্নমানের এসএসসি ফলাফলের কারণ জানতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর আলাদা নজরদারি রাখা হবে। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু ফলাফল খারাপ হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, মানসম্মত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জবাবদিহি এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তা ও কার্যকর একাডেমিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির বিষয়টি যথাযথভাবে তদারকি না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ফল বিপর্যয়ের পেছনে টেস্ট পরীক্ষায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
বাদশাগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়টি অবহেলিত হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের ওপর আশপাশের কয়েকটি এলাকার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। ফলে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার এমন ফলাফলকে শুধু একটি বিদ্যালয়ের ফল বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, এটি হাওরাঞ্চলের শিক্ষার সামগ্রিক মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি সতর্ক সংকেত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, জবাবদিহি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ একাডেমিক কার্যক্রম চালু করা গেলে আগামীতে বিদ্যালয়টির ফলাফল ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন এলাকা বাসী।
মন্তব্য করুন