
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নারী সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে যে কয়েকটি নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম নূরজাহান বেগম। সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও নারী জাগরণে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন তাঁকে দেশের নারী সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন নূরজাহান বেগম। তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সওগাত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। শৈশব থেকেই সংবাদপত্র ও সাহিত্যচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পান নূরজাহান বেগম।
তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীদের জন্য সংবাদপত্রে কাজ করা কিংবা প্রকাশনা ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছিল অত্যন্ত সীমিত ও কঠিন। এমন বাস্তবতার মধ্যেই তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা ও দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।
‘বেগম’ পত্রিকা ও নতুন অধ্যায়
১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘বেগম’ পত্রিকা। এটি মূলত নারীদের জন্য প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকী হিসেবে দ্রুত পরিচিতি লাভ করে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনার সঙ্গে নূরজাহান বেগমের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
‘বেগম’ শুধু নারীদের সাহিত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম ছিল না; নারী শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, অধিকার, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার বিভিন্ন বিষয়ও এতে গুরুত্ব পেত। এর মাধ্যমে বহু নারী লেখক ও সাহিত্যিক তাঁদের লেখালেখির সুযোগ পান।
ফলে নূরজাহান বেগমের ভূমিকা কেবল একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। নারী লেখক ও সাংবাদিকদের জন্য একটি প্রকাশনার ক্ষেত্র তৈরি করতেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নারী সাংবাদিকতার পথচলায় অবদান
বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় নূরজাহান বেগমকে প্রায়ই প্রথম সারির নারী সাংবাদিক ও নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে ‘প্রথম নারী সাংবাদিক’ পরিচয়টি ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সময়কাল ও সংজ্ঞার পার্থক্য রয়েছে—বাংলা অঞ্চলে তাঁর আগেও নারী লেখক ও সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত নারীদের নজির পাওয়া যায়।
তবু পূর্ববাংলায় নারী সাংবাদিকতা ও নারী-কেন্দ্রিক প্রকাশনার বিকাশে নূরজাহান বেগমের অবদান ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কর্মজীবন পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
স্বীকৃতি ও সম্মান
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে নূরজাহান বেগম বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। নারী সাংবাদিকতা ও সমাজে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর কর্ম ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আজকের নারী সাংবাদিকতার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগসূত্র
বর্তমানে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, রেডিও ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় বিপুলসংখ্যক নারী কাজ করছেন। মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং থেকে শুরু করে সম্পাদনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা ও সংবাদ ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান।
এই দীর্ঘ পথচলার ইতিহাসে নূরজাহান বেগমের নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক সীমাবদ্ধতার সময় সাংবাদিকতায় প্রবেশ করে তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে সেই পথ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
নূরজাহান বেগম তাই শুধু একটি নাম নন; বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক।
মন্তব্য করুন