বিশ্বম্ভরপুরে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৫ হাজার টাকা দাবির অভিযোগের পক্ষে মেলেনি স্বাধীন প্রমাণ, অনুসন্ধানে ফিরোজা বেগম ও তাঁর মায়ের ভিন্ন বক্তব্য
মোঃ শুকুর আলী, স্টাফ রিপোর্টার:
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৩নং ধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে ভিজিডি কার্ড দেওয়ার নামে পাঁচ হাজার টাকা দাবির অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘কালের নিউজ’ নামের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে ফিরোজা বেগম নামের এক নারীকে কান্নাজড়িত অবস্থায় নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে দেখা যায়। তবে দৈনিক বিকাল বার্তার অনুসন্ধানে ওই নারীর পরবর্তী বক্তব্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সামনে আসায় প্রচারিত অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ফিরোজা বেগমের স্বামীর নাম মোঃ অজুদ এবং মায়ের নাম রহেলা বেগম। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা হিসেবে রাজধানীর গুলশান এলাকার রসুলবাগ পূর্ব, দক্ষিণ পাড়া উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে তিনি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চান্দেরগাঁও এলাকায় বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে ঢাকার ঠিকানা থাকা ফিরোজা বেগম কীভাবে ধনপুর ইউনিয়নের ভিজিডি কর্মসূচির সুবিধাভোগী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন? তিনি আদৌ ওই কর্মসূচিতে আবেদন করেছিলেন কি না এবং তাঁর নাম সুবিধাভোগীদের তালিকায় রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে ঢাকার ঠিকানা থাকলেই অন্য ইউনিয়নে সরকারি সুবিধা পাওয়া আইনগতভাবে অসম্ভব—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রকৃত বসবাস, সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির নীতিমালা এবং স্থানীয় প্রশাসনের যাচাইয়ের ভিত্তিতে তাঁর যোগ্যতা নির্ধারিত হবে।
চেয়ারম্যানকে চেনেন না বলে দাবি ফিরোজা বেগমের
ভাইরাল ভিডিওতে চেয়ারম্যান মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ সামনে এলেও পরবর্তী সময়ে দৈনিক বিকাল বার্তার তথ্য সংগ্রহকালে ফিরোজা বেগম ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তাঁর দাবি, তিনি চেয়ারম্যান মিলন মিয়াকে চেনেন না এবং কখনো দেখেনওনি। চেয়ারম্যান তাঁর কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছেন—এমন ঘটনার কথাও তিনি জানেন না বলে জানান।
ফিরোজা বেগমের মা রহেলা বেগমও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওর বক্তব্য ও পরবর্তী সময়ে পাওয়া বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় চেয়ারম্যান মোঃ মিলন মিয়া ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ফিরোজা বেগমকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফিরোজা বেগম ও তাঁর মা রহেলা বেগমকে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার কথাও জানা গেছে। তবে এসব সহায়তার দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
অন্যদিকে রহেলা বেগম দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
‘কালের নিউজ’-এ প্রচারিত ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চেয়ারম্যান মিলন মিয়াকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে ফিরোজা বেগম ও তাঁর মায়ের পরবর্তী বক্তব্যে অভিযোগের সমর্থন পাওয়া যায়নি।
এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার টাকা দাবির অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া মানেই সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া নয়।
ভিডিওটি কীভাবে ধারণ করা হয়েছে, ফিরোজা বেগমের সম্পূর্ণ বক্তব্য কী ছিল এবং অভিযোগের পক্ষে অন্য কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক তদন্তে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচারের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিরোজা বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্রে ঢাকার ঠিকানা, বর্তমানে ধনপুর ইউনিয়নে তাঁর বসবাসের তথ্য, ভিজিডি কর্মসূচিতে আবেদনের যোগ্যতা এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগ—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রয়োজন।
বিশেষ করে ফিরোজা বেগমের নাম সরকারি সুবিধাভোগীর তালিকায় রয়েছে কি না এবং তাঁর কাছে সত্যিই কোনো অর্থ দাবি করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মিলন মিয়া এবং ‘কালের নিউজ’-এর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
ভাইরাল ভিডিওর অভিযোগ ও পরবর্তী অনুসন্ধানে পাওয়া বক্তব্যের অসংগতি নিরসনে নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের কার্যকর পথ।
মন্তব্য করুন