চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আস্তার রহমান (চৌডালা সেতু) এলাকায় এক প্রতিবন্ধী স্কুটিচালকের কাছ থেকে টোল আদায়ের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি শুধু ৫ বা ১০ টাকার টোল আদায়ের বিষয় নয়, বরং একজন প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জানান, প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার স্কুটিগাড়ি নিয়ে নিয়মিত ওই সেতু ব্যবহার করে আসছেন। এ সময়ের মধ্যে কখনো তার কাছ থেকে কোনো টোল নেওয়া হয়নি। এমনকি বিভিন্ন পার্ক বা অন্য স্থানেও তাকে আলাদা করে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভাগিনাকে সঙ্গে নিয়ে চৌডালা হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে সেতুর টোল ঘরে তাকে আটক করে জোর পূর্বক টোল দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, “আমি তাদের বলেছি, এতদিন তো কোনো টাকা নেয়নি। হঠাৎ আজ কেন দিতে হবে? তখন তারা বলে এখন থেকে দিতে হবে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, প্রতিবন্ধীদের কাছ থেকে টোল নেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম বা নির্দেশনা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আমাকে দেখাতে বলেন। কিন্তু তারা বলে, গাড়ি পার হয়েছে তাই টাকা দিতেই হবে।”
তিনি আরও জানান, একপর্যায়ে কথা কাটাকাটির সৃষ্টি হলে তিনি বলেন, “ঠিক আছে, পরেরবার থেকে যদি নিয়ম থাকে তাহলে দেবো।” তখন টোল আদায়কারী ব্যক্তি জানান, বিষয়টি মালিকের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মালিক অনুমতি দিলে ভবিষ্যতে ফ্রি পারাপার করা যাবে। তবে সেদিনের টাকা অবশ্যই দিতে হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে টাকা ছাড়া যেতে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তারা বলেন, “ভাই, তাকে ছেড়ে দেন।” কিন্তু টোল আদায়কারী ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত টাকা ছাড়া তাকে যেতে দেননি। পরে বাধ্য হয়ে টাকা পরিশোধ করেই তিনি বাড়ি ফিরে যান।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকার পরিমাণ বড় বিষয় না। কিন্তু একজন অচল ও অসহায় মানুষের প্রতি সামান্য সহানুভূতি না দেখানো খুব কষ্টের। আমরা প্রতিবন্ধীরাও কারো দয়ায় বাঁচতে চাই না। আমরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য মাসে ৭০০ বা ৯০০ টাকা ভাতা দেয়, সেটাও নিয়মিত পাওয়া যায় না। তিন মাস পর পর অপেক্ষা করতে হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সেখানে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে এখনও প্রতিবন্ধীরা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি শুধু একটি টোল আদায়ের ঘটনা নয়, এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধেরও প্রতিচ্ছবি। তারা মনে করেন, প্রতিবন্ধীদের চলাচল, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই ব্যক্তি সেতু ব্যবহার করলেও আগে কখনো তাকে টোল দিতে হয়নি। হঠাৎ করে এভাবে টাকা আদায় করায় এলাকাবাসীর মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ছাড় বা মানবিক বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
এ বিষয়ে টোল ঘরের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের উচিত প্রতিবন্ধীদের চলাচল ও সেবা নিশ্চিত করতে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং জনসাধারণকে মানবিক আচরণের বিষয়ে সচেতন করা।
সচেতন নাগরিকরা বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। তারাও দেশের নাগরিক। তাদের প্রতি সহানুভূতি নয়, অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, গোমস্তাপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আস্তার রহমান (চৌডালা সেতু) টোলপ্লাজায় টোল আদায়কারী কয়েকজন যুবক প্রায় সময় পারাপারকারীদের সাথে খারাপ আচরণ করে। সচেতন মহলের দাবি এখানে ভদ্রলোক রাখা উচিৎ যাতে করে ভালো ব্যবহার পায়।
মন্তব্য করুন