ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতকে আদালতের স্থগিতাদেশ ও প্রশাসনিক নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় জলমহালে মাছ আহরণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের দাইড়-ফুলফুলি জলমহালে গত ২৩ অক্টোবর থেকে মাছ আহরণ শুরু করেছে স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এ ঘটনায় জলমহালের ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল জলমহালটি ইজারা দেওয়ার লক্ষ্যে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ইজারা পেতে আবেদন করে জনতা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড (পাথারীপুর), জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি (গণেশপুর), জাগরণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি (মেজরটুক) এবং স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড (কুচবাড়ি)।
আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম নিকটবর্তী হিসেবে জনতা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলমহালটি ইজারা দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় নিকটবর্তী দাবিদার জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করে। তার অভিযোগ, জনতা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির দাখিল করা কাগজপত্রে জালিয়াতি রয়েছে এবং সমিতিটি প্রকৃতপক্ষে জলমহালের নিকটবর্তী নয়। এ বিষয়ে পুনরায় তদন্তের আবেদনও করা হয়। তবে অভিযোগটির নিষ্পত্তি না করেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে চতুর্থ আবেদনকারী স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলমহালটি ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জলতরী সমিতির সদস্যরা। বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ২৯ এপ্রিল সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আপিল করেন জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসেন। আবেদনে ইজারা প্রদানের সিদ্ধান্তকে বেআইনি উল্লেখ করে তদন্তের মাধ্যমে তা বাতিলের দাবি জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত গত ১৬ জুন জলমহালটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় বিষয়টি পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সুনামগঞ্জের আদালতে গড়ায়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বিবিধ আপিল (জলমহাল) মোকদ্দমা নম্বর ১৪/২০২৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সুনামগঞ্জের আদালত একটি আদেশ দেন। ওই আদেশে জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার সাকিবুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জলমহালটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৭ অক্টোবর। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আদালতের ওই আদেশ ও প্রশাসনিক স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় গত ২৩ অক্টোবর থেকেই জলমহালে মাছ আহরণ শুরু করে স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। মাছ আহরণ বন্ধের দাবিতে জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও কার্যকর কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসেন।
এদিকে, গত ২৭ অক্টোবর আদালতের পরবর্তী আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনারের স্বাক্ষরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে ২২ সেপ্টেম্বরের আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিটি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং মামলার উভয় পক্ষের সমিতির সভাপতিকে পাঠানো হয়েছে। এ মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ৩ নভেম্বর উল্লেখ করা হয়। আদালতের আদেশ, প্রশাসনিক স্থগিতাদেশ এবং পরবর্তী সময়ে আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি পাঠানোর পরও জলমহালে মাছ আহরণের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আদালতের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে জলমহালে মাছ আহরণ চলছে?
অভিযোগকারী জলতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসেন বলেন, ‘ইজারার নিয়ম অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী মৎস্যজীবী সমিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। সরেজমিনে সঠিক তদন্ত করলে দেখা যাবে, আমরাই জলমহালের সবচেয়ে নিকটবর্তী। অথচ আমাদের ইজারা না দিয়ে প্রথমে জনতা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে দেওয়া হয়। আমরা অভিযোগ করার পরও তা নিষ্পত্তি না করে পরবর্তী সময়ে চতুর্থ আবেদনকারী স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা ছাড়া আবেদনকারীর কেউই জলমহালের প্রকৃত পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা নয়। আমাদের ইজারা না দেওয়ার কারণও জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, স্বপ্নীল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জিয়াউর রহমান মাছ আহরণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমি বৈধভাবে জলমহালটি ইজারা পেয়েছি। প্রথম ও তৃতীয় আবেদনকারীর কাগজপত্র সঠিক না থাকায় দ্বিতীয় ও চতুর্থ আবেদনকারীর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর আমরা মাছ আহরণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইজারা পাওয়ার পাঁচ মাস পর আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে। এখন আমার ক্ষয়ক্ষতির দায় কে নেবে?
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন পিপিএম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখেন। তিনি যেকোনো সময় পুলিশি সহযোগিতা চাইলে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব। এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও বিষয়টি নিয়ে তাদের আবার সতর্ক করে দিচ্ছি।
মন্তব্য করুন