
“আমাকে বাঁচতে দেওয়া হলো না” অডিটের চাপে গ্রামীণ ব্যাংক কর্মকর্তার আত্মহত্যা। কয়েকদিন ধরে গ্রামীণ ব্যাংক সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছী শাখায় অডিট চলছিল। অডিটের চাপে হতাশাগ্রস্থ ছিলেন শাখা ব্যবস্থাপক মো. আব্দুস সালাম (৫০)। তিনি সহকর্মীদের বলছিলেন, ‘আমাকে বাঁচতে দেওয়া হলো না। আমি মারা যাব’। অবশেষে গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করে নিজের প্রাণ দিলেন তিনি। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যগণ। গঠনতন্ত্রে রয়েছে, সদস্যগণ কিস্তি না দিলেও তাদের প্রতি মামলা করা যাবে না। তাদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ করে টাকা আদায় করতে হবে। অথচ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপর চলছে অমানুষিক নির্যাতন এবং তাদের উপর চালাচ্ছে ট্রিমরোলার। যার জ্বলন্ত প্রমাণ সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ ব্যাংক নিমগাছী শাখা ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর ২০২৬) রাত ৯টার দিকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এদিকে এ ঘটনায় তিন অডিট অফিসারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন গ্রামীণ ব্যাংক কর্মীগণ ও বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে ।
নিহত আব্দুস সালাম পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার বাসিন্দা। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কর্মস্থলের নিমগাছী গ্রামীণ ব্যাংক শাখার পাশেই ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
গ্রামীণ ব্যাংক নিমগাছী শাখার কর্মীরা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরেই ব্যাংকে অডিট কার্যক্রম চলছিল। এ সময় ম্যানেজার আব্দুস সালামকে উদ্বিগ্ন ও হতাশাগ্রস্ত মনে হচ্ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি দুটি গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেন। পরে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর অডিট কমিটির তিন সদস্যকে আটক করে ব্যাংকের কর্মী ও বিক্ষুব্ধ জনগণ। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তিন অডিট অফিসারকে আটক করে।
তিনজন অডিট কর্মকর্তাদের অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখে বিক্ষুব্ধ কর্মচারী ও স্থানীয় জনতা। শফিকুল ইসলাম নামে এক কর্মী বলেন, অডিট চলাকালে আব্দুস সালাম বলেছিলেন ‘আমাকে বাঁচতে দেওয়া হলো না। আমি মারা যাব’-তখন গ্যাস ট্যাবলেট সেবনের কথা জানান। তাৎক্ষণিক তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামীণ ব্যাংকের একাধিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাংকের টার্গেট পূর্ণ করা ও পকেট কিস্তির কারণে প্রতিটি কর্মী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই চাপে থাকেন। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা-১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাদের। শুক্র-শনিবার সরকারি ছুটি থাকলেও প্রতি শনিবারই বকেয়া আদায়ের জন্য মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর বছরে বছরে রয়েছে অডিটের চাপ। এসব কারণে চরম নির্যাতিত হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীরা। তারা বলেন, অডিট অফিসারদের অতিরিক্ত চাপের কারণেই আব্দুস সালামের মতো শাখা ব্যবস্থাপককে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে।
এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের রায়গঞ্জ এরিয়া ম্যানেজার মো. মহিউদ্দিন বলেন, অডিট অফিসার ঢুকলে চাপ তো কিছু থাকবেই। কিছু যদি অনিয়ম হয়, তাহলে তো কিছু কথা অডিট অফিসাররা বলবেই। সদস্যদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে-সেগুলো আবার ম্যানেজারকে বলবে।
উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক মাসে আমাদের টার্গেট থাকে। সেটাকেই যদি চাপ মনে করে, সেটা থাকবেই। প্রতি প্রতিষ্ঠানেরই পরিকল্পনা থাকে। তেমনি আমাদেরও পরিকল্পনা থাকে।
রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তার আত্মহত্যার ঘটনায় তিন অডিট অফিসারকে অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অডিট কর্মকর্তাদের থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহত আব্দুস সালামের মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াহবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে তবুও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টনক নড়েনি। আবার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আাদায় নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করতেও দেখা যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে তাহলে কি এটা আসলেই রক্তচোষা গ্রামীণ ব্যাংক ? আরো কত জনের রক্ত নিলে তাদের টার্গেট পূর্ণ হবে এই প্রশ্ন সুশীল সমাজের।
মন্তব্য করুন