পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার কামারপাড়াগুলোতে ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলছে কামারশালার লাল টকটকে কয়লার আগুন। লোহা পুড়িয়ে পিটিয়ে নতুন দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি ও কুড়াল তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার শত শত কামার শিল্পী। একই সাথে চলছে পুরোনো ভোঁতা হয়ে যাওয়া সরঞ্জামগুলোতে শান দেওয়ার কাজ। যেন টুংটাং শব্দেই জানান দিচ্ছে ঈদের আগমনী বার্তা।
সরেজমিনে ভেড়ামারার বিভিন্ন কামারশালা ঘুরে দেখা যায়, কারিগরদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও হাত থামানোর কোনো উপায় নেই। কয়লার উনুনে ফুঁসছে হাঁপর, লাল টকটকে লোহা বের করে আনা হচ্ছে নেহাইয়ের ওপর। এরপর দুই-তিনজনের সম্মিলিত হাতুড়ির নিখুঁত ও ছন্দোময় আঘাতে লোহা রূপ নিচ্ছে ধারালো অস্ত্রে।
স্থানীয় কামাররা জানান, বছরের অন্য ১১ মাস ব্যবসা কোনো রকমে চললেও এই একটি মৌসুমের আয়ের ওপর তাঁদের পুরো বছরের সংসার খরচ ও দেনা-পাওনা পরিশোধ নির্ভর করে। তাই এই সময়টাতে দিন-রাত এক করে সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে কাজ করছেন তাঁরা।
আগুনের উত্তাপের সাথে বাড়ছে চিন্তার ভাঁজ
ব্যস্ততা বাড়লেও কামারদের কপালে চিন্তার ভাঁজও স্পষ্ট। কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাজারে লোহা, ইস্পাত এবং কয়লার দাম গত বছরের তুলনায় অনেকটাই বেশি। কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে তাঁদের উৎপাদন খরচ এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়েই নতুন তৈরি করা সরঞ্জামের দাম কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের।
দরদাম ও বর্তমান বাজারদর:
কামারশালাগুলো ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে আকার ও মানভেদে সরঞ্জামগুলো বিক্রি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দামে—
বড় জবাই করার ছুরি: ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা
মাংস কাটার চাপাতি: ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা
সাধারণ দা: ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা
ঐতিহ্যবাহী বঁটি: ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা
অন্যদিকে, পুরোনো সরঞ্জাম শান বা নতুন করে ধার দেওয়ার জন্য কাজের ধরন অনুযায়ী ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
কামারশালাগুলোতে আসা ক্রেতারা জানান, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছরই তাঁদের নতুন ছুরি বা দা কিনতে হয় অথবা পুরোনোটা ধার করিয়ে নিতে হয়। তবে বাজারে এবার দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় অনেকেই বাজেটের সাথে মিলিয়ে দরদাম করে কেনাকাটা করছেন।
ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের কারিগররা আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়া এবং কাঁচামালের চড়া মূল্যের কারণে কামার শিল্প এখন ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই প্রাচীন কুটির শিল্পকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
তবে সমস্ত সংকট আর ক্লান্তি ভুলে, কোরবানির ঈদের এই বাড়তি আয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু ভালোভাবে ঈদ উদযাপনের স্বপ্ন বুনছেন ভেড়ামারার শত শত কামার শিল্পী।
মন্তব্য করুন